গ্রন্থ আলোচনা : রুদ্রপ্র‍য়াগের মানুষখেকো চিতাবাঘ (The Man -Eating Leopard of Rudraprayag)




গ্রন্থ : রুদ্রপ্র‍য়াগের মানুষখেকো চিতাবাঘ (The Man -Eating Leopard of Rudraprayag) 
লেখক- জিম করবেট ( Jim Corbett)
প্রকাশকাল- ১৯৪৭
প্রথম প্রকাশক- অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস ( Oxford University Press)


বইটি হাতে পাই ২০০২ সালের শেষের দিকে। ক্লাস থ্রিতে ফাইনাল পরীক্ষার পর এক আন্টি বইটি উপহার দেয়। পড়া শুরু করি অনেক পরে। প্রথমবার পড়লাম ক্লাস ফাইভে ওঠার পর। শেষ করতে দুইমাস লেগেছিল। হয়ত বলা যেতে পারে খুব ধীর গতিতে এগিয়েছি। কিন্তু ধীর গতির কারণ বয়স অথবা অভ্যাস নয়। ধীর গতির কারণ ছিল 'ভয়'। এই বইটি পড়ার সময় 'ভয়' শব্দটির মর্মার্থ প্রথমবারের মত বুঝতে পেরেছি। অবশ্য ভাবতে পারেন যে, ভয় একটি সাধারণ বিষয়। ভয় লাগতেই পারে। কিন্তু এই 'ভয়' সেই সাধারণ ভয় নয়। এই 'ভয়' সামগ্রিক। এই 'ভয়' একটি পুরো সমাজ কালো ছায়ায় ঢেকে যাওয়ার মত। যেই অনুভুতি কখনো কেটে যাওয়ার নয়। যেটি অনন্তকাল ধরে অনুভব করার মত। 

এরকমই কালো ছায়া নেমে এসেছিল ভারতের রুদ্রপ্রয়াগ (Rudraprayag) নামক জায়গায়। প্রায় আট বছর (১৯১৮-১৯২৬) ধরে রাজত্ব করে প্রায় ১২৫ জন মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল একটি চিতাবাঘ। এটি 'রুদ্রপ্রয়াগের মানুষখেকো' হিসেবে স্বীকৃতি পায়। শিকারী জিম করবেট-এর হাতে রুদ্রপ্রয়াগের কুখ্যাত মানুষখেকো চিতাবাঘের মৃত্যু হয় ১৯২৬ সালের ২মে। আর এই চিতাবাঘের খোঁজে বহু নির্ঘুম রাত আর ভয়ার্ত সব অভিজ্ঞতার বর্ণনা Jim Corbett ( জিম করবেট) তুলে ধরেছেন তাঁর The Man-Eating Leopard of Rudraprayag (রুদ্রপ্রয়াগের মানুষখেকো চিতাবাঘ) বইটির মাধ্যমে। 

বইটি শুধুমাত্র একটি শিকার কাহিনী নয়—এটি ভয়ের এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক যাত্রা। ভারতের রুদ্রপ্রয়াগ (Rudraprayag) অঞ্চলে ঘটে যাওয়া বাস্তব ঘটনাকে কেন্দ্র করে গল্পটি গড়ে উঠেছে, যেখানে একটি চিতাবাঘ দীর্ঘদিন ধরে গ্রামবাসীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল। রুদ্রপ্রয়াগ ভারতের উত্তরাখণ্ড অঞ্চলের একটি জেলা যা ওই দেশের একটি তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিত। অঞ্চলটি  অলকানন্দা এবং মন্দাকিনী নদীর সঙ্গমস্থলে অবস্থিত। এই বিশাল অঞ্চলের ত্রাস হয়ে ওঠে গল্পে বর্ণিত চিতাবাঘ। চিতাবাঘটি ওই অঞ্চলের গ্রামবাসী এবং তীর্থযাত্রীদেরকে তার শিকার হিসেবে লক্ষ্য স্থির করেছিল। এই গল্পের আসল শক্তি ঘটনায় নয়, বরং অদৃশ্য আতংকের আবহে। চিতাবাঘটিকে এখানে শুধু একটি হিংস্র প্রাণী হিসেবে দেখানো হয়নি; বরং তাকে এক রহস্যময়, প্রায় অলৌকিক উপস্থিতি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, যাকে খুব কম দেখা যায়, কিন্তু সবসময় অনুভব করা যায়। করবেট গ্রামের মানুষের অসহায়তা, তাদের দৈনন্দিন জীবনের ভেঙে পড়া ছন্দ, আর নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শিকার করার মানসিক চাপ, সবকিছু অত্যন্ত বাস্তবভাবে তুলে ধরেছেন। একই সাথে তিনি এই প্রশ্নও তোলেন, কেন একটি প্রাণী মানুষখেকো হয়ে ওঠে? এর পেছনে মানুষেরই কোনো দায় আছে কি না। এই ভাবনাগুলো গল্পটিকে শুধু “মানুষ বনাম প্রাণী” সংঘর্ষে সীমাবদ্ধ রাখে না, বরং এটিকে ভয়, বেঁচে থাকা এবং নৈতিক দায়িত্বের এক গভীর প্রতিচ্ছবিতে পরিণত করে।

জিম করবেট (Jim Corbett)- এর ব্যক্তিগত জীবন উল্লিখিত বইটি বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের উত্তরাখণ্ড প্রদেশের কুমায়ুন বিভাগের নৈনিতালে (Nainital) জন্ম নেওয়া করবেট ছোটবেলা থেকেই জঙ্গলের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। জিম করবেট (১৮৭৫-১৯৫৫) একজন ব্রিটিশ-ভারতীয় নাগরিক ছিলেন এবং তাঁর পুরো নাম ছিল জেমস এডওয়ার্ড করবেট (James Edward Corbett)।  তিনি শুধুমাত্র একজন শিকারি ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন দক্ষ পর্যবেক্ষক, গ্রামবাসীদের রক্ষক এবং পরবর্তীতে একজন পরিবেশসংরক্ষণবিদ। তিনি কখনোই বিনা কারণে শিকার করতেন না, শুধুমাত্র সেইসব প্রাণীকেই হত্যা করতেন, যারা বিশেষ পরিস্থিতির কারণে মানুষখেকো হয়ে উঠেছিল। জীবনের শেষ দিকে এসে তিনি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের পক্ষে সোচ্চার হন এবং তাঁর নামেই প্রতিষ্ঠিত হয় Jim Corbett National Park। তাঁর জীবনের এই রূপান্তর, শিকারি থেকে সংরক্ষণবাদী, তাঁর লেখাতেও স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে, যেখানে নিখুঁত পর্যবেক্ষণ, মানবিকতা এবং প্রকৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা একসাথে মিশে গেছে।

বইটি পাঠকের মনে গভীর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলে। এটি কেবল একটি গল্প নয়, বরং ভয়কে ব্যক্তিগত অনুভূতিতে রূপান্তর করে। পাঠক যেন নিজেই অন্ধকার জঙ্গলে হাঁটছে, প্রতিটি শব্দে চমকে উঠছে, আর অদৃশ্য কোনো উপস্থিতির আশঙ্কায় ভুগছে। একই সাথে বইটি আমাদের শেখায় প্রকৃতিকে নতুনভাবে দেখতে, এখানে প্রাণীটি “খলনায়ক” নয়, বরং পরিস্থিতির শিকার। এই উপলব্ধি মানুষের প্রকৃতির উপর আধিপত্যের ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং সহাবস্থানের গুরুত্বকে তুলে ধরে। করবেটের ধীর, ধৈর্যশীল বর্ণনা পাঠকের মধ্যে এক ধরনের মানসিক চাপ এবং উত্তেজনা তৈরি করে, যেখানে শক্তির চেয়ে বুদ্ধি ও সময়জ্ঞান বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সবচেয়ে বড় বিষয়, বইটি শেষ হওয়ার পরও একটি প্রশ্ন মনে থেকে যায়, আসল দোষী কে? প্রাণীটি, নাকি সেই পরিস্থিতি যা তাকে এমন করে তুলেছে? এই প্রশ্নই বইটিকে একটি সাধারণ শিকার কাহিনীর চেয়ে অনেক বেশি গভীর এবং স্মরণীয় করে তোলে।


-HUSSAIN HAIDER SAADOR

(THE PHOTO AT COVER IS CUSTOM-DESIGNED ONLY FOR REVIEW PURPOSES  )

Read an analysis on the movie 'INCEPTION'

Click- INCEPTION - A Masterpiece Beyond Reality

Comments

Popular posts from this blog

What is time?

মানকাডিং (Mankading) : ক্রিকেটীয় চেতনা বিরোধী আইন

INCEPTION - A Masterpiece Beyond Reality